৭ম জাতীয় কাউন্সিলে গৃহিত রাজনৈতিক প্রস্তাবসমূহ
৭ম জাতীয় কাউন্সিলে গৃহিত রাজনৈতিক প্রস্তাবসমূহ
আন্দোলন প্রতিবেদন
শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | অনলাইন সংস্করণ
[রাজনৈতিক প্রস্তাবাবলির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রকাশ করা হল। এছাড়াও জায়গা স্বল্পতার কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, অর্থনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম, কমিউনিস্ট আন্দোলন, ভারতের গণযুদ্ধ সমর্থনে আন্তর্জাতিক কমিটি'র সম্মেলন বিষয়গুলো দেয়া গেল না। – সম্পাদনা বোর্ড]
চলমান দেশীয় রাজনীতি
হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান: সুদীর্ঘ ১৬ বছর ধরে হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণের লড়াই-সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে, বিশেষত '২৪-এর ছাত্র-তরুণ-জনতার গণঅভ্যুত্থানে এই ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে। যা ছাত্রসমাজ ও শ্রমজীবী-দরিদ্র ও জনতার সংগ্রামের এক বিরাট বিজয়। যদিও তথাকথিত 'অরাজনৈতিক' ছাত্র-নেতৃত্বদের একাংশ এ অভ্যুত্থানে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করে অভ্যুত্থানের ফসলকে নিজেদের পকেটে পোরার অপচেষ্টায় লিপ্ত। যা পরিষ্কার হয়ে যায় তাদের দ্বারা বিগত এক বছরের বেশি সময় ধরে তথাকথিত 'নতুন বন্দোবস্তু'র নামে পুরোনো দেশ-বিরোধী ও গণ-বিরোধী বুর্জোয়া রাজনীতিতে সামিল হওয়ার মধ্য দিয়ে। তারা এখন অপরাপর বুর্জোয়া রাজনীতিক দলগুলোর মতোই গণ-বিরোধী ক্ষমতার কামড়াকামড়িতে ব্যস্ত।
আমরা এ গণ-অভ্যুত্থানে যুক্ত সকল ছাত্র-জনতাকে অভিনন্দন জানাই। শহিদদের প্রতি জানাই শ্রদ্ধা এবং আহতদের সুচিকিৎসার জোর দাবি জানাই। আমরা তাদের পরিবারবর্গের প্রতি সহমর্মীতা জানাই।
এটা আজ পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, ৫ আগস্টের পরে ক্ষমতাসীন ও তাদের সহায়তাকারী শক্তি বর্গের গণবিরোধী রাজনীতির কারণে সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা বজায় রয়েছে, পাশাপাশি উত্থান ঘটেছে ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট ও নব্য ফ্যাসিবাদী তথাকথিত 'অরাজনৈতিক' ও 'তৃতীয় শক্তি'র। এভাবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তাই, এ অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক দুর্বলতা ও বিচ্যুতি সম্পর্কে সচেতন হবার জন্য ছাত্র-তরুণ ও প্রগতিশীল রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, তথাকথিত সংস্কার ও নির্বাচন: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট'২৪ হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর "অভ্যুত্থানের সরকার" বলে যা প্রতিষ্ঠিত হয় তা হলো একই শাসকশ্রেণির ভিন্ন গোষ্ঠীগুলোর যৌথ ক্ষমতা। যার কেন্দ্রে রয়েছে তথাকথিত তৃতীয় শক্তি। এর মধ্য দিয়ে অভ্যুত্থানের জন-আকাঙ্ক্ষা অঙ্কুরেই মাটিচাপা পড়ে।
সেনা সমর্থিত, সাম্রাজ্যবাদের অনুগত সামরিক-বেসামরিক আমলা, এনজিও কর্মকর্তা এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের বুদ্ধিজীবীরা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতাদের একাংশ মিলে গঠিত এই "অন্তর্বর্তী সরকার" একদিকে বিদ্যমান সংবিধানকে উর্ধ্বে রাখার শপথ করেছে, পাশাপাশি তারা সংকট মোচনের জন্য বিদ্যমান সংবিধান-বিরোধী বহু কার্যক্রম চালিয়েছে। এরই সুযোগ নিয়ে এবং জন-আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের নব্য-স্বার্থে ব্যবহার করা ও ভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এদের একাংশ বিদ্যমান ব্যবস্থাকে রক্ষা করে ও তার অধীনেই তথাকথিত 'নতুন সংবিধান'র আওয়াজ তুলেছে।
এ সরকার ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার নানা ষড়যন্ত্র করে। তারা তথাকথিত সংস্কার-এর এক মূলা জনগণ ও বুর্জোয়া রাজনীতির সামনে ঝুলিয়ে দেয়। যে সংস্কার হলো হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের ফলে সৃষ্ট বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির শাসন সংকটকে মেরামত করার প্রচেষ্টা। এই তথাকথিত সংস্কারে শ্রমিক-কৃষক-নারী-আদিবাসী-ছাত্র তরুণসহ ব্যাপক জনগণের স্বার্থে কিছুই নেই।
দেশি-বিদেশি চাপের মুখে এবং নিজেদের ব্যর্থতা ও সংকটের কারণে প্রায় দেড় বছরের মাথায় ফেব্রুয়ারি' ২৬-এর প্রথামার্ধে জাতীয় নির্বাচন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে এ সরকার। কিন্তু তৃতীয় শক্তির বিরাজনীতিকরণের ফর্মুলায় নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রও চলমান। নির্বাচনকে ঘিরে তথাকথিত ফ্যাসিবাদ-বিরোধী বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলোর কামড়াকামড়িও তীব্র হয়ে উঠেছে। একইসাথে পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা তাদের প্রভু ভারতের সহায়তায় দেশ ও গণবিরোধী ষড়যন্ত্রও চালিয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে দেশ ও জনগণ এক গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি তাদের নিজেদের গভীর সংকটকে জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়েছে ও দিচ্ছে।
বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব/কোন্দল হচ্ছে গণ-বিরোধী ক্ষমতার বড় ভাগটা পাওয়ার কামড়াকামড়ি। আগামী বুর্জোয়া নির্বাচনে জনগণের কোনোই লাভহবে না এবং মুক্তিও আসবে না। তেমনি অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর ফ্যাসিস্ট হাসিনার ফাঁসির রায়েও শাসকশ্রেণির ভিন্ন গোষ্ঠীরা লাভবান হবে, জনগণ নয়।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত-নারী-আদিবাসীসহ ব্যাপক জনগণের প্রতি আহ্বান রাখছে- নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদ, দালাল শাসকশ্রেণির গণবিরোধী কর্মসূচির বিপরীতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক কর্মসূচি তুলে ধরুন এবং গণতান্ত্রিক সংবিধান-সরকার-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বেগবান করার জন্য সচেতন ও সংগঠিত হোন।
তথাকথিত জুলাই সনদ: জুলাই সনদ হচ্ছে বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির "তৃতীয় শক্তি"র রাজনীতি ও আপস-ফর্মুলা, বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির হাসিনা-বিরোধী অংশগুলোর আপাত ঐক্য ও কোন্দলের দলিল। এতে জনগণের মৌলিক শত্রু মার্কিন-রাশিয়া-চীনসহ সকল সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী শ্রমিক-কৃষক-নারী-আদিবাসী এবং মধ্যবিত্তসহ সহ নিপীড়িত জনগণের কোনো কর্মসূচিই নেই।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন এই সনদ প্রত্যাখ্যান করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।
বিরাজনীতিকরণ: অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেই "৩য় শক্তি" কর্তৃক মদদপ্রাপ্ত ও পূর্ব থেকে চলা বিরাজনীতিকরণের চক্রান্ত শুরু করে। তার অংশ হিসেবে তাদের অনুগত ছাত্র-নেতৃত্বদের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পাঁয়তারা চালিয়েছে। বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অংশ ছাত্রলীগের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাস-দখলদারিত্বের রাজনীতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করেছে। এই ন্যায্য ক্ষোভকে ব্যবহার করে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের চক্রান্ত চলছে। তারা শিক্ষার্থীদের একাংশকে বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিতে সজ্জিত করেছে। যার সুযোগে ধর্মবাদী এর ফলাফল দেখা গিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-সংসদ নির্বাচনে। '৫২, '৬২, '৬৯, '৭১, '৯০, '২৪-এর আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সচেতন রাজনৈতিক ভূমিকাকে আড়াল করে বিরাজনীতিকরণের বিষবাষ্প ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের সুস্থ ধারার রাজনীতি থেকে পরিকল্পিত ভাবে বিমুখ করছে। যাতে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিপ্লবী রাজনীতির বিকাশ ঘটতে না পারে।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন 'তৃতীয় শক্তি' ও ধর্মবাদীদের বিরাজনীতিকরণের ষড়যন্ত্রের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।
ধর্মবাদী নব্য ফ্যাসিবাদী উত্থান: হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর তার জায়গায় স্থান করে নিয়েছে ধর্মবাদী নব্য ফ্যাসিবাদ। হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদ রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার করে বিগত ১৬ বছর ধর্মবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে তাদের উত্থানের ভিত্তি শক্তিশালী করে দিয়েছে। এমনকি নিষিদ্ধ '৭১-এর গণহত্যাকারী জামাতের সহযোগী সংগঠন ছাত্র-শিবিরও ছাত্রলীগের ভেতরে থেকেই নিজেদের সংগঠিত করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারও একইভাবে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের প্রশ্রয়-আশ্রয় দিচ্ছে। অন্যদিকে বিরাজনীতিকরণের রাজনীতি করে চলেছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে আদিবাসী শব্দ উঠিয়ে দেয়াসহ ধর্মবাদীদের প্রতিটি দাবির কাছে সরকার নতি স্বীকার করেছে। এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শরীরচর্চার শিক্ষক বাতিল করেছে এবং সেখানে ধর্মের শিক্ষক নিয়োগের চক্রান্ত করছে। ধর্মীয় উগ্রতায় লালন মেলা, শরৎ উৎসব, একুশে বইমেলা ও ভাস্কর্য শিল্প রক্ষা পায়নি। বাউল-সুফিবাদী বৃদ্ধদের লম্বা চুল কেটে চরম দৈহিক ও অমানবিক নিপীড়ন-নির্যাতন চলছে। প্রগতিশীল কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীগণ তাদের থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। তারা জোর করে ইসলামী সংস্কৃতির নামে ধর্মবাদ চালুর দাবি তুলছে। এক কথায় জামায়াত সহ ধর্মবাদীদের নেতৃত্বে "তৌহিদী জনতা"র ব্যানারে চলছে এক ভয়াবহ মব রাজত্ব। ছাত্র-যুব আন্দোলন ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার্থী সহ সর্বস্তরের জনগণকে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।
শিক্ষা: বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই যে শিক্ষা-ব্যবস্থা এবং শিক্ষানীতি দেশে চালু রয়েছে তা সাম্রাজ্যবাদের প্রেসক্রিপশনে তৈরি এবং আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ ও সামন্ততান্ত্রিক ভাবধারায় সজ্জিত। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যকার আমলা-সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতাচর্চার সংস্কৃতিই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। অন্তর্বর্তী সরকার বহু সংস্কারের কথা বললেও শিক্ষার সংস্কারের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং ধর্মবাদীদের দাবির মুখে নতি স্বীকার করে পাঠ্যপুস্তক থেকে আদিবাসী শব্দ যুক্ত গ্রাফিতি বাতিল করেছে। প্রাথমিকে সংগীত ও শরীরচর্চার শিক্ষক বাতিল করেছে এবং তার প্রকৃত উদ্দেশ্য, ধর্মবাদী ফ্যাসিস্টদের কাছে নতিস্বীকারকে আড়াল করার জন্য আর্থিক সংকটের কুযুক্তি দিয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২১-এ হাসিনা শিক্ষাব্যবস্থা ডিজিটালাইজেশন করার মধ্য দিয়ে দেশের শ্রমিক-কৃষকসহ ব্যাপক নিপীড়িত অংশের পড়াশোনায় তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। প্রত্যেকটি শাসকগোষ্ঠীই শ্রমিক কৃষকের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার সংকুচিত করেছে, করছে। হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সে শিক্ষাক্রম ফেলে তথাকথিত শিক্ষার্থী বান্ধব সেজে পুরোনো শিক্ষাক্রম ফিরিয়ে আনে। যে শিক্ষাক্রমও সাম্রাজ্যবাদের প্রেসক্রিপশনে তৈরি। সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা ছাত্র-তরুণদের আত্মপ্রতিষ্ঠাকামী হিসেবে গড়ে তোলে। এবং সাম্রাজ্যবাদের প্রেসক্রিপশনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজগুলোকে বেসরকারিকরণ ও সরকারি-বেসরকারি উভয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ করছে।
সাম্রাজ্যবাদের প্রেসক্রিপশনে (ইউজিসি, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক প্রণোদিত IQAC (Institutional Quality Assurance Cell), PPP (Public-Private Partnership) সহ সকল প্রকল্প বাতিল) তাদের দালাল আমলা ও ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের নামে দক্ষ টেকনোক্র্যাট বানানোর শিক্ষানীতি বাতিল করে- সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদবিরোধী বিজ্ঞান ভিত্তিক, উৎপাদনমুখি, ধর্মবিযুক্ত, বৈষম্যহীন, একমুখী, মাতৃভাষায় শিক্ষানীতি তথা নয়াগণতান্ত্রিক শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন দৃঢ় সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। এবং এই লড়াইয়ে সর্বস্তরের ছাত্র: সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
জাতীয় স্বার্থের জলাঞ্জলি: অন্তর্বর্তী সরকার দেশ ও জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং র্টামিনালসহ ৪ টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে। তুলে দিচ্ছে। তার মধ্য দিয়ে মার্কিনের চীন ঘেরাও নীতি বাস্তবায়িত হবে। বাংলাদেশ ও দেশের জনগণকে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের পাঁয়তারায় জড়িয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ সিদ্ধির লক্ষে কাজ করছে। অপরদিকে চীন-রাশিয়ান সাম্রাজ্যবাদীদের সাথেও সুসম্পর্ক বজায় রাখছে। মুখে মুখে ভারত বিরোধিতা করলেও ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সাথে হাসিনার সরকারের সম্পাদিত কোনো চুক্তিই বাতিল করে নি। বরং ভারতকে এবার ইলিশ মাছের সাথে আমও পাঠিয়েছে। এই সরকার সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের সাথে সম্পাদিত গণবিরোধী চুক্তিসমূহ জনগণের সামনে প্রকাশ ও বাতিলও করে নি। বরং একের পর এক গণবিরোধী চুক্তি করে যাচ্ছে।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন সর্বস্তরের জনগণকে সরকারের সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ তোষণ/নতজানু নীতির বিরুদ্ধে তীব্র বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।
কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব: বাংলাদেশ একটি আধা-সামন্ততান্ত্রিক, নয়া উপনিবেশিক সমাজ-ব্যবস্থা। বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ এবং তাদের দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি শ্রেণি। গ্রামে এখনও জোতদার, মহাজন, ইজারাদার, ব্যবসায়ী শ্রেণি উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। আত্মনির্ভরশীল কৃষি বা শিল্পায়নের বিকাশের পথ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। জনগণের স্বার্থ রক্ষা না করে বিদেশি বিনিয়োগকারী শাসকশ্রেণি ও তাদের রাষ্ট্র শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত এবং দেশীয় বড় বুর্জোয়া মালিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। তথাকথিত সংস্কারে কৃষি ও শিল্পের ক্ষেত্রে কোনো সংস্কারের পদক্ষেপই নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার। ২০১৮ সাল থেকে '২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের মূলে ছিল সরকারি চাকুরিতে সুযোগ সৃষ্টি করে বৈষম্য দূর করা। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার চাকরি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে কোনো ভূমিকাই রাখেনি। সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর অর্থনীতিই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করে বেকারত্ব তৈরি করে তরুণ প্রজন্যকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বেকারত্বের ফলে হতাশাগ্রস্ত তরুণেরা বিদেশমুখী ও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে এবং দেশের শ্রমশক্তি দ্বাংস হচ্ছে।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ, আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদবিরোধী আত্মত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে নয়াগণতান্ত্রিক তথা কৃষি-বিপ্লবের সহায়ক শক্তি হিসেবে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এ সংগ্রামে ছাত্র-যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
নারী-শিশু ও LGBTQ (এলজিবিটিকিউ) সম্পর্কিত: জুলাই অভ্যুত্থানের দাবিদার সরকার আমলেও সারাদেশে নারী-শিশু নির্যাতন-ধর্ষণ-হত্যা: বেড়েই চলছে। অন্তর্বর্তী সরকার এবছরের ফেব্রুয়ারিতে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের উপর পুলিশী লাঠিচার্জ করে ধর্ষকের পক্ষেই নগ্ন অবস্থান নিয়েছে। এ সরকারের আমলে নারী নির্যাতনের নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। নারীর ফুটবল খেলা, পোশাক, চলাফেরা স্বাধীনতায়ও হস্তক্ষেপ-লাঞ্ছনা করছে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা। উত্তরাধিকার সূত্রে জমি-সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার আইন করার বিরোধিতাও করছে এই ফ্যাসিবাদীরা। পাহাড়ে সেনা শাসনের মাধ্যমে নারীদের উপর চলছে বর্ধিত নিপীড়ন।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ দ্বারা নিপীড়িত পুরুষতান্ত্রিক এই রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে সর্বস্তরের নিপীড়িত নারীদের বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।
একই সাথে হিজড়া, ট্রান্সজেন্ডারসহ LGBTQ সম্প্রদায়ের জনগণের উপর সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের নিপীড়ন-নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপনের অধিকার প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানাচ্ছে।
পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী সম্পর্কিত: পাহাড় ও সমতলে আদিবাসীদের উপর হত্যা-দমন-নির্যাতন ধর্ষণের মাত্রা আরও তীব্র হয়েছে। পাহাড়ে রাষ্ট্র-সেনাদের মদদে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। আদিবাসী নেতা বিপুল চাকমাসহ অনেককে হত্যা করা হয়েছে। পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় মদদে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত চলছে।
পাহাড়ের মূল সমস্যা হচ্ছে সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর উপর জাতিগত নিপীড়ন। এরই অংশ হিসেবে পাহাড়ি জাতিসত্তার প্রথাগত ভূমি মালিকানা থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। তার অংশ হিসেবে নারী নির্যাতন চলছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার ও তাদের সাথে ক্ষমতার ভাগ-পাওয়া প্রতারকরা সংস্কারের যত বড় বড় বুলিই ছাতুক না কেন, পার্বত্য অঞ্চলে নিপীড়িত জাতিসত্তাগুলোর জন্য কোনো একটি হাতবাচক সংস্কারও তারা করেনি।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন মনে করে পাহাড়ের জনগণের সমস্যার সমাধান করতে হলে ভূমি সমস্যার সমাধান ও সেখানে জাতিগত নিপীড়নের সম্পূর্ণ অবসান ঘটাতে হবে। ভূমি সমস্যার সমাধানের সাথে পাহাড়ের লোভের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ও পৃথক জাতিসত্তার স্বীকৃতি, পাহাড়ে জোর পূর্বক গরিব বাঙালি জনগণের পুনর্বাসন বন্ধ করা, পাহাড়ে অঘোষিত সেনা-শাসনের অবসান ঘটানো এবং পার্বত্য অঞ্চলের পরিপূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা। পাহাড়িদের জন্য মায়াকান্না করলেও সাম্রাজ্যবাদীরা ও এনজিওরা এসব মৌলিক কর্মসূচিকে কার্যত তুলে ধরে না।
তাই পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে প্রয়োজন শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লবী কর্মসূচির ভিত্তিতে প্রকৃত শত্রুর বিরুদ্ধে আদিবাসী-বাঙালি জনগণের ঐক্যবদ্ধ লড়াই চালিয়ে যাওয়া।
কৃষি এবং কৃষক সমস্যা: বাংলাদেশ একটি কৃষ্টিপ্রধান দেশ। কিন্তু কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদী অনুপ্রবেশ প্রায় প্রতিবছরই হাওরের কৃষকদের বন্যার সম্মুখীন হতে হয়। প্রতিবছরই বাজেটে বাঁধের জন্য বরাদ্দ থাকলেও নির্মাণ হয় না টেকসই বাঁধ। যার ফলে বাঁধ ভেঙে লক্ষ লক্ষ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গিয়ে দিচ্ছে। দেশের স্বনির্ভর কৃষিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো থেকে সার বীজ, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষক। সার, বীজ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, তেলের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় কৃষকরা উৎপাদন খরচ মিটিয়ে লাভবান হতে পারছেন না। অন্তর্বর্তী সরকার বর্তমানে সার ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। কৃষিপণ্যের বাজার- সিন্ডিকেট নির্ভরতার দরুন কৃষকদের উদ্বৃত্ত মূল্য শোষণ করে নিচ্ছে আমলা-মুৎসুদ্দি শ্রেণি। অন্তর্বর্তী সরকারও পূর্বের সরকারগুলোর মতোই কৃষিতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ায়নি। চায়নি। হাওরের মানুষেরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। খরায় উত্তরাঞ্চলেও কৃষকদের দুর্বিষহ অবস্থা। সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনে ঘূর্ণিজড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা-খরায় লক্ষ লক্ষ কৃষক জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন।
গত ২৬ মার্চ থেকে ২৫ আগষ্ট পর্যন্ত ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে, ঋণের বোঝা পরিশোধ করতে না পেরে ৯ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন বলে সংবাদ মাধ্যম হতে জানা যায়। সাম্রাজ্যবাদ, আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ ও এনজিওদের শোষণ-নির্যাতনের কারণে কৃষক জনগণ সর্বশান্ত ও হতাশ হচ্ছেন। কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী কালো থাবার কারণেই কৃষকদের দূরবস্থা এবং এই কারণেই আত্মহত্যার প্রবণতা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর কৃষি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন। বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন মনে করে বিপ্লবী মতাদর্শে সজ্জিত কৃষকরাই কৃষি বিপ্লবের জন্য দিতে পারে।
শ্রমিক সমস্যা: নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য থেকে শুরু করে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য আকাশগুমী। কিন্তু বাড়েনি শ্রমিকের বেতন। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য ২০২৩ সালে শ্রমিকেরা জঙ্গি আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাদের ন্যায্য আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালিয়েও য়ের শ্রমিককে হত্যা করে। ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের পতন হলে তার সাথে পালিয়ে যায় তার দালাল গার্মেন্টস মালিকদের একাংশ। শ্রমিকেরা বকেয়া মজুরির দাবিতে আন্দোলন করলে সেখানেও ইউনুসের পুলিশ বাহিনী গুলি চালিয়ে ৪ জন শ্রমিককে হত্যা করে এবং আহত করে শতাধিককে। পরিবহন শ্রমিক, চা শ্রমিক, ধানকল শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিকসহ সকল সেক্টরের শ্রমিকদেরই মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন সরকারের এহেন গণবিরোধী চরিত্রের তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছে। এবং গার্মেন্টসসহ সকল সেক্টরের শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ২৫,০০০ টাকা করার জোর দাবি জানাচ্ছে।
* পোশাক কারখানায় দূর্গটনার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এবছরেই অক্টোবরে অগ্নিকান্ডে ঢাকার মিরপুরে পোশাক কারখানায় ১৬ জন নিহত এবং চট্টগ্রামের । সিইপিজেডে ৭ তলা একটি গার্মেন্টসে, কালশিতে একটি গার্মেন্টসে আগুন লেগে শত শত শ্রমিক কর্মহারা হন। বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন রাষ্ট্র এবং মালিক শ্রেণির দায়িত্বহীনতা এবং অব্যবস্থাপনায় তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।
ট্রাফিক পুলিশের সহায়তাকারী হিসেবে নিয়োগ নেয়া টালিকার্থীরা গণবিরোধী সিস্টেমের সাথে সোপ্রোতভাবে জড়িয়ে রিক্সা শ্রমিকদের উপর নিপীড়ন ভরে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভবঘুরে উচ্ছেদের বামে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
* প্যাডেল চালিত এবং ব্যাটারি চালিত শ্রমিকদের মধ্যে অবৈরী অন্দকে বৈরিতায় রূপ দিচ্ছে গণবিরোধী সরকার ও রাষ্ট্র। ব্যাটারিচালিত রিক্সা মালিক ও শ্রমিকদের বিকল্প ব্যবস্থা না করে রিক্সা উচ্ছেদ ও চালকদের হয়রানিকে বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন প্রতিবাদ করছে এবং রিক্সা শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে এর বিরুদ্ধে লড়াই করার আহ্বান জানাচ্ছে।
* সকল সেক্টরে নারী শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক ওভারটাইম, হোলনাইট বাতিল এবং সবেতনে ৬ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রদানের দাবি জানাচ্ছে। প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন-মানের উন্নয়ন, নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নারী শ্রমিকদের শারীরিক-মানসিক এবং যৌন নির্যাতন বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছে।
* বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নামে আদম পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে অসংখ্য যুবকের দুর্বিসহ ভোগান্তির অবসান, দায়ীদের উপযুক্ত শান্তি ও ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরতদানের ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক
চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন অর্থনীতি চাঙ্গা করতে অভ্যন্তরীণ বায় কমানো এবং বাণিজ্য যুদ্ধের মাধমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প বিশ্বের ৫৭টি দেশের পণ্য রপ্তানির উপর ৫০% শুদ্ধ আরোপ করে। চীনসহ দেশে দেশে দর কষাকষি করে নিজ স্বার্থ আদায় করে কিছু শুল্ক কমাচ্ছে। বাংলাদেশ তার মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে চীন-রাশিয়াকে কোণঠাসা করে বিশ্বব্যাপী মার্কিন কর্তৃত্ব বজায় রাখা বা মধ্যপ্রাচ্যে একক কর্তৃত্ব সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ চলছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে মার্কিন মদদে গণহত্যা চলছে। ইসরায়েল-ফিলিস্ক্রিন তথাকথিত যুদ্ধ বিরতির নি নামে চলছে মার্কিন-ইসরয়েলি দখলদারিত্ব। সিরিয়ায় রুশপন্থী ফ্যাসিস্ট সরকারকে উচ্ছেদ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মার্কিনের দালাল ফ্যাসিস্ট শক্তি। মার্কিন সহ বিশ্ব জনগণের উপর যুদ্ধসহ অর্থনৈতিক চাপ মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে নেমে আসছে। সাম্রাজাবাদী সংকট এখন ৩য় বিশ্বযুদ্ধের দিকে আগাচ্ছে। বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদী অন্যায় যুদ্ধ প্রতিহত করতে ছাত্র-যুব-তরুণদের সোচ্চার হতে আহ্বান জানাচ্ছে।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের অপারেশন কাগার: হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট মোদী সরকার “অপারেশন কাগার” নামের সামরিক অভিযান চালিয়ে ভারতের মাওবাদী ও সাধারণ আদিবাসী জনগণকে হত্যা-দমন-নির্যাতন করে মাওবাদীদের নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক-আদিবাসীদের বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে। বিশ্বের গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল পার্টি, সংগঠন, শক্তি ও নিপীড়িত জনগণ এর নিন্দা ও প্রতিবাদ করছে। কমরেড বাসবরাজসহ মাওবাদী নেতা-কর্মী ও আদিবাসী জনগণের গণহত্যার আমরা তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।
মাওবাদীদের আত্মসমর্পণ মঞ্চস্থ সম্পর্কে: তীব্র দমন-পীড়নের মধ্যে মোদি সরকার মাওবাদীদের আত্মসমর্পণ নাটক মঞ্চস্ত করছে। এর নায়ক হচ্ছে ভেনুগোপাল (সোনু) নামে এক বিশ্বাসঘাতক। ভারতের মাওবাদী পার্টির নেতৃত্বগণ এর বিরুদ্ধে দুই লাইনের সংগ্রাম চালিয়ে বিশ্বাসঘাতকদের মুখোশ উন্মোচন করছেন এবং বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামকে উর্ধ্বে তুলে ধরছেন এই লাইনে কর্মী-জনগণকে উজ্জীবিত করছেন। দুই লাইনের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি রক্ষা ও বিকশিত হবে।
ভারতসহ বিশ্বের দেশে দেশে বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক, প্রগাতিশীল পার্টি-সংগঠন এবং নিপীড়িত অনগণের সাথে বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন ভারতের মাওবাদীদের দ্বারা চালিত গণযুদ্ধকে উর্ধ্বে তুলে ধরছে এবং আত্মসমর্পণকারীদের বর্জন করছে।
দেশে দেশে জেন-জিদের আন্দোলন: বিশ্বের দেশে দেশে (বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলংকা, পেরু, মাদাগাস্কার) তরুণরা সাম্রাজ্যাবাদী বিশ্ব ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত বিদ্রোহ করছেন। এর আগে আরব বসন্ত মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী তরুণদের এই বিদ্রোহ-বিক্ষোভকে আমরা দৃঢ়ভাবে সমর্থন করছি। একই সাথে তরুণদের প্রতি আহ্বান সাম্রাজ্যবাদ, দালাল শাসকশ্রেণির ক্ষমতা-বহির্ভূতদের ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না হয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের আদর্শে সজ্জিত হয়ে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে কৃষি-বিপ্লবের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার-সংবিধান-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সামিল হোন!
মতাদর্শগত: চেয়ারম্যান মাও সে-তুঙ-এর মৃত্যুর পরপরই সংশোধনবাদীরা সমাজতান্ত্রিক চীনের ক্ষমতা দখল করে। সেই থেকে শুরু হওয়া অধঃপতনের এ পর্যায়ে ভুয়া কমিউনিস্ট পার্টির নেতা শি জিন পিং বিশ্বমোড়ল হওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে সে লক্ষ্যেই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মার্কিনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শি জিন পিং চিন্তাধারা নামে প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শ এক সময়ের নিপীড়িত জনগণের সমাজতান্ত্রিক চীনকে গণবিরোধী সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদী চীনে পরিণত করেছে। এই চীন দেশকে আবার সিপিবি সহ আরও কিছু বাম সংগঠন সমাজতান্ত্রিক চীন বলে গুণগান করছে। বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন ভুয়া সমাজতন্ত্রীদের মুখোশ উন্মোচন এবং একই সাথে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের দেশ চীনের জনগণকে চেয়ারম্যান মাও সে-তুঙের শিখিয়ে দেওয়া পথ অনুসরণ করে ভুয়া কমিউনিস্ট পার্টিকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহবান জানাচ্ছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
৭ম জাতীয় কাউন্সিলে গৃহিত রাজনৈতিক প্রস্তাবসমূহ
[রাজনৈতিক প্রস্তাবাবলির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রকাশ করা হল। এছাড়াও জায়গা স্বল্পতার কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, অর্থনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম, কমিউনিস্ট আন্দোলন, ভারতের গণযুদ্ধ সমর্থনে আন্তর্জাতিক কমিটি'র সম্মেলন বিষয়গুলো দেয়া গেল না। – সম্পাদনা বোর্ড]
চলমান দেশীয় রাজনীতি
হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান: সুদীর্ঘ ১৬ বছর ধরে হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণের লড়াই-সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে, বিশেষত '২৪-এর ছাত্র-তরুণ-জনতার গণঅভ্যুত্থানে এই ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে। যা ছাত্রসমাজ ও শ্রমজীবী-দরিদ্র ও জনতার সংগ্রামের এক বিরাট বিজয়। যদিও তথাকথিত 'অরাজনৈতিক' ছাত্র-নেতৃত্বদের একাংশ এ অভ্যুত্থানে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করে অভ্যুত্থানের ফসলকে নিজেদের পকেটে পোরার অপচেষ্টায় লিপ্ত। যা পরিষ্কার হয়ে যায় তাদের দ্বারা বিগত এক বছরের বেশি সময় ধরে তথাকথিত 'নতুন বন্দোবস্তু'র নামে পুরোনো দেশ-বিরোধী ও গণ-বিরোধী বুর্জোয়া রাজনীতিতে সামিল হওয়ার মধ্য দিয়ে। তারা এখন অপরাপর বুর্জোয়া রাজনীতিক দলগুলোর মতোই গণ-বিরোধী ক্ষমতার কামড়াকামড়িতে ব্যস্ত।
আমরা এ গণ-অভ্যুত্থানে যুক্ত সকল ছাত্র-জনতাকে অভিনন্দন জানাই। শহিদদের প্রতি জানাই শ্রদ্ধা এবং আহতদের সুচিকিৎসার জোর দাবি জানাই। আমরা তাদের পরিবারবর্গের প্রতি সহমর্মীতা জানাই।
এটা আজ পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, ৫ আগস্টের পরে ক্ষমতাসীন ও তাদের সহায়তাকারী শক্তি বর্গের গণবিরোধী রাজনীতির কারণে সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা বজায় রয়েছে, পাশাপাশি উত্থান ঘটেছে ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট ও নব্য ফ্যাসিবাদী তথাকথিত 'অরাজনৈতিক' ও 'তৃতীয় শক্তি'র। এভাবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তাই, এ অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক দুর্বলতা ও বিচ্যুতি সম্পর্কে সচেতন হবার জন্য ছাত্র-তরুণ ও প্রগতিশীল রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, তথাকথিত সংস্কার ও নির্বাচন: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট'২৪ হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর "অভ্যুত্থানের সরকার" বলে যা প্রতিষ্ঠিত হয় তা হলো একই শাসকশ্রেণির ভিন্ন গোষ্ঠীগুলোর যৌথ ক্ষমতা। যার কেন্দ্রে রয়েছে তথাকথিত তৃতীয় শক্তি। এর মধ্য দিয়ে অভ্যুত্থানের জন-আকাঙ্ক্ষা অঙ্কুরেই মাটিচাপা পড়ে।
সেনা সমর্থিত, সাম্রাজ্যবাদের অনুগত সামরিক-বেসামরিক আমলা, এনজিও কর্মকর্তা এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের বুদ্ধিজীবীরা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতাদের একাংশ মিলে গঠিত এই "অন্তর্বর্তী সরকার" একদিকে বিদ্যমান সংবিধানকে উর্ধ্বে রাখার শপথ করেছে, পাশাপাশি তারা সংকট মোচনের জন্য বিদ্যমান সংবিধান-বিরোধী বহু কার্যক্রম চালিয়েছে। এরই সুযোগ নিয়ে এবং জন-আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের নব্য-স্বার্থে ব্যবহার করা ও ভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এদের একাংশ বিদ্যমান ব্যবস্থাকে রক্ষা করে ও তার অধীনেই তথাকথিত 'নতুন সংবিধান'র আওয়াজ তুলেছে।
এ সরকার ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার নানা ষড়যন্ত্র করে। তারা তথাকথিত সংস্কার-এর এক মূলা জনগণ ও বুর্জোয়া রাজনীতির সামনে ঝুলিয়ে দেয়। যে সংস্কার হলো হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের ফলে সৃষ্ট বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির শাসন সংকটকে মেরামত করার প্রচেষ্টা। এই তথাকথিত সংস্কারে শ্রমিক-কৃষক-নারী-আদিবাসী-ছাত্র তরুণসহ ব্যাপক জনগণের স্বার্থে কিছুই নেই।
দেশি-বিদেশি চাপের মুখে এবং নিজেদের ব্যর্থতা ও সংকটের কারণে প্রায় দেড় বছরের মাথায় ফেব্রুয়ারি' ২৬-এর প্রথামার্ধে জাতীয় নির্বাচন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে এ সরকার। কিন্তু তৃতীয় শক্তির বিরাজনীতিকরণের ফর্মুলায় নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রও চলমান। নির্বাচনকে ঘিরে তথাকথিত ফ্যাসিবাদ-বিরোধী বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলোর কামড়াকামড়িও তীব্র হয়ে উঠেছে। একইসাথে পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা তাদের প্রভু ভারতের সহায়তায় দেশ ও গণবিরোধী ষড়যন্ত্রও চালিয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে দেশ ও জনগণ এক গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি তাদের নিজেদের গভীর সংকটকে জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়েছে ও দিচ্ছে।
বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব/কোন্দল হচ্ছে গণ-বিরোধী ক্ষমতার বড় ভাগটা পাওয়ার কামড়াকামড়ি। আগামী বুর্জোয়া নির্বাচনে জনগণের কোনোই লাভহবে না এবং মুক্তিও আসবে না। তেমনি অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর ফ্যাসিস্ট হাসিনার ফাঁসির রায়েও শাসকশ্রেণির ভিন্ন গোষ্ঠীরা লাভবান হবে, জনগণ নয়।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত-নারী-আদিবাসীসহ ব্যাপক জনগণের প্রতি আহ্বান রাখছে- নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদ, দালাল শাসকশ্রেণির গণবিরোধী কর্মসূচির বিপরীতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক কর্মসূচি তুলে ধরুন এবং গণতান্ত্রিক সংবিধান-সরকার-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বেগবান করার জন্য সচেতন ও সংগঠিত হোন।
তথাকথিত জুলাই সনদ: জুলাই সনদ হচ্ছে বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির "তৃতীয় শক্তি"র রাজনীতি ও আপস-ফর্মুলা, বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির হাসিনা-বিরোধী অংশগুলোর আপাত ঐক্য ও কোন্দলের দলিল। এতে জনগণের মৌলিক শত্রু মার্কিন-রাশিয়া-চীনসহ সকল সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী শ্রমিক-কৃষক-নারী-আদিবাসী এবং মধ্যবিত্তসহ সহ নিপীড়িত জনগণের কোনো কর্মসূচিই নেই।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন এই সনদ প্রত্যাখ্যান করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।
বিরাজনীতিকরণ: অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেই "৩য় শক্তি" কর্তৃক মদদপ্রাপ্ত ও পূর্ব থেকে চলা বিরাজনীতিকরণের চক্রান্ত শুরু করে। তার অংশ হিসেবে তাদের অনুগত ছাত্র-নেতৃত্বদের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পাঁয়তারা চালিয়েছে। বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অংশ ছাত্রলীগের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাস-দখলদারিত্বের রাজনীতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করেছে। এই ন্যায্য ক্ষোভকে ব্যবহার করে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের চক্রান্ত চলছে। তারা শিক্ষার্থীদের একাংশকে বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিতে সজ্জিত করেছে। যার সুযোগে ধর্মবাদী এর ফলাফল দেখা গিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-সংসদ নির্বাচনে। '৫২, '৬২, '৬৯, '৭১, '৯০, '২৪-এর আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সচেতন রাজনৈতিক ভূমিকাকে আড়াল করে বিরাজনীতিকরণের বিষবাষ্প ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের সুস্থ ধারার রাজনীতি থেকে পরিকল্পিত ভাবে বিমুখ করছে। যাতে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিপ্লবী রাজনীতির বিকাশ ঘটতে না পারে।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন 'তৃতীয় শক্তি' ও ধর্মবাদীদের বিরাজনীতিকরণের ষড়যন্ত্রের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।
ধর্মবাদী নব্য ফ্যাসিবাদী উত্থান: হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর তার জায়গায় স্থান করে নিয়েছে ধর্মবাদী নব্য ফ্যাসিবাদ। হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদ রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার করে বিগত ১৬ বছর ধর্মবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে তাদের উত্থানের ভিত্তি শক্তিশালী করে দিয়েছে। এমনকি নিষিদ্ধ '৭১-এর গণহত্যাকারী জামাতের সহযোগী সংগঠন ছাত্র-শিবিরও ছাত্রলীগের ভেতরে থেকেই নিজেদের সংগঠিত করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারও একইভাবে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের প্রশ্রয়-আশ্রয় দিচ্ছে। অন্যদিকে বিরাজনীতিকরণের রাজনীতি করে চলেছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে আদিবাসী শব্দ উঠিয়ে দেয়াসহ ধর্মবাদীদের প্রতিটি দাবির কাছে সরকার নতি স্বীকার করেছে। এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শরীরচর্চার শিক্ষক বাতিল করেছে এবং সেখানে ধর্মের শিক্ষক নিয়োগের চক্রান্ত করছে। ধর্মীয় উগ্রতায় লালন মেলা, শরৎ উৎসব, একুশে বইমেলা ও ভাস্কর্য শিল্প রক্ষা পায়নি। বাউল-সুফিবাদী বৃদ্ধদের লম্বা চুল কেটে চরম দৈহিক ও অমানবিক নিপীড়ন-নির্যাতন চলছে। প্রগতিশীল কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীগণ তাদের থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। তারা জোর করে ইসলামী সংস্কৃতির নামে ধর্মবাদ চালুর দাবি তুলছে। এক কথায় জামায়াত সহ ধর্মবাদীদের নেতৃত্বে "তৌহিদী জনতা"র ব্যানারে চলছে এক ভয়াবহ মব রাজত্ব। ছাত্র-যুব আন্দোলন ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার্থী সহ সর্বস্তরের জনগণকে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।
শিক্ষা: বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই যে শিক্ষা-ব্যবস্থা এবং শিক্ষানীতি দেশে চালু রয়েছে তা সাম্রাজ্যবাদের প্রেসক্রিপশনে তৈরি এবং আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ ও সামন্ততান্ত্রিক ভাবধারায় সজ্জিত। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যকার আমলা-সামন্ততান্ত্রিক ক্ষমতাচর্চার সংস্কৃতিই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। অন্তর্বর্তী সরকার বহু সংস্কারের কথা বললেও শিক্ষার সংস্কারের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং ধর্মবাদীদের দাবির মুখে নতি স্বীকার করে পাঠ্যপুস্তক থেকে আদিবাসী শব্দ যুক্ত গ্রাফিতি বাতিল করেছে। প্রাথমিকে সংগীত ও শরীরচর্চার শিক্ষক বাতিল করেছে এবং তার প্রকৃত উদ্দেশ্য, ধর্মবাদী ফ্যাসিস্টদের কাছে নতিস্বীকারকে আড়াল করার জন্য আর্থিক সংকটের কুযুক্তি দিয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২১-এ হাসিনা শিক্ষাব্যবস্থা ডিজিটালাইজেশন করার মধ্য দিয়ে দেশের শ্রমিক-কৃষকসহ ব্যাপক নিপীড়িত অংশের পড়াশোনায় তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। প্রত্যেকটি শাসকগোষ্ঠীই শ্রমিক কৃষকের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার সংকুচিত করেছে, করছে। হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সে শিক্ষাক্রম ফেলে তথাকথিত শিক্ষার্থী বান্ধব সেজে পুরোনো শিক্ষাক্রম ফিরিয়ে আনে। যে শিক্ষাক্রমও সাম্রাজ্যবাদের প্রেসক্রিপশনে তৈরি। সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা ছাত্র-তরুণদের আত্মপ্রতিষ্ঠাকামী হিসেবে গড়ে তোলে। এবং সাম্রাজ্যবাদের প্রেসক্রিপশনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজগুলোকে বেসরকারিকরণ ও সরকারি-বেসরকারি উভয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ করছে।
সাম্রাজ্যবাদের প্রেসক্রিপশনে (ইউজিসি, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক প্রণোদিত IQAC (Institutional Quality Assurance Cell), PPP (Public-Private Partnership) সহ সকল প্রকল্প বাতিল) তাদের দালাল আমলা ও ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের নামে দক্ষ টেকনোক্র্যাট বানানোর শিক্ষানীতি বাতিল করে- সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদবিরোধী বিজ্ঞান ভিত্তিক, উৎপাদনমুখি, ধর্মবিযুক্ত, বৈষম্যহীন, একমুখী, মাতৃভাষায় শিক্ষানীতি তথা নয়াগণতান্ত্রিক শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন দৃঢ় সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। এবং এই লড়াইয়ে সর্বস্তরের ছাত্র: সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
জাতীয় স্বার্থের জলাঞ্জলি: অন্তর্বর্তী সরকার দেশ ও জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং র্টামিনালসহ ৪ টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে। তুলে দিচ্ছে। তার মধ্য দিয়ে মার্কিনের চীন ঘেরাও নীতি বাস্তবায়িত হবে। বাংলাদেশ ও দেশের জনগণকে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের পাঁয়তারায় জড়িয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ সিদ্ধির লক্ষে কাজ করছে। অপরদিকে চীন-রাশিয়ান সাম্রাজ্যবাদীদের সাথেও সুসম্পর্ক বজায় রাখছে। মুখে মুখে ভারত বিরোধিতা করলেও ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সাথে হাসিনার সরকারের সম্পাদিত কোনো চুক্তিই বাতিল করে নি। বরং ভারতকে এবার ইলিশ মাছের সাথে আমও পাঠিয়েছে। এই সরকার সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের সাথে সম্পাদিত গণবিরোধী চুক্তিসমূহ জনগণের সামনে প্রকাশ ও বাতিলও করে নি। বরং একের পর এক গণবিরোধী চুক্তি করে যাচ্ছে।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন সর্বস্তরের জনগণকে সরকারের সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ তোষণ/নতজানু নীতির বিরুদ্ধে তীব্র বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।
কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব: বাংলাদেশ একটি আধা-সামন্ততান্ত্রিক, নয়া উপনিবেশিক সমাজ-ব্যবস্থা। বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ এবং তাদের দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি শ্রেণি। গ্রামে এখনও জোতদার, মহাজন, ইজারাদার, ব্যবসায়ী শ্রেণি উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। আত্মনির্ভরশীল কৃষি বা শিল্পায়নের বিকাশের পথ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। জনগণের স্বার্থ রক্ষা না করে বিদেশি বিনিয়োগকারী শাসকশ্রেণি ও তাদের রাষ্ট্র শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত এবং দেশীয় বড় বুর্জোয়া মালিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। তথাকথিত সংস্কারে কৃষি ও শিল্পের ক্ষেত্রে কোনো সংস্কারের পদক্ষেপই নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার। ২০১৮ সাল থেকে '২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের মূলে ছিল সরকারি চাকুরিতে সুযোগ সৃষ্টি করে বৈষম্য দূর করা। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার চাকরি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে কোনো ভূমিকাই রাখেনি। সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর অর্থনীতিই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করে বেকারত্ব তৈরি করে তরুণ প্রজন্যকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বেকারত্বের ফলে হতাশাগ্রস্ত তরুণেরা বিদেশমুখী ও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে এবং দেশের শ্রমশক্তি দ্বাংস হচ্ছে।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ, আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদবিরোধী আত্মত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে নয়াগণতান্ত্রিক তথা কৃষি-বিপ্লবের সহায়ক শক্তি হিসেবে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এ সংগ্রামে ছাত্র-যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
নারী-শিশু ও LGBTQ (এলজিবিটিকিউ) সম্পর্কিত: জুলাই অভ্যুত্থানের দাবিদার সরকার আমলেও সারাদেশে নারী-শিশু নির্যাতন-ধর্ষণ-হত্যা: বেড়েই চলছে। অন্তর্বর্তী সরকার এবছরের ফেব্রুয়ারিতে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের উপর পুলিশী লাঠিচার্জ করে ধর্ষকের পক্ষেই নগ্ন অবস্থান নিয়েছে। এ সরকারের আমলে নারী নির্যাতনের নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। নারীর ফুটবল খেলা, পোশাক, চলাফেরা স্বাধীনতায়ও হস্তক্ষেপ-লাঞ্ছনা করছে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরা। উত্তরাধিকার সূত্রে জমি-সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার আইন করার বিরোধিতাও করছে এই ফ্যাসিবাদীরা। পাহাড়ে সেনা শাসনের মাধ্যমে নারীদের উপর চলছে বর্ধিত নিপীড়ন।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ দ্বারা নিপীড়িত পুরুষতান্ত্রিক এই রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে সর্বস্তরের নিপীড়িত নারীদের বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।
একই সাথে হিজড়া, ট্রান্সজেন্ডারসহ LGBTQ সম্প্রদায়ের জনগণের উপর সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের নিপীড়ন-নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপনের অধিকার প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানাচ্ছে।
পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী সম্পর্কিত: পাহাড় ও সমতলে আদিবাসীদের উপর হত্যা-দমন-নির্যাতন ধর্ষণের মাত্রা আরও তীব্র হয়েছে। পাহাড়ে রাষ্ট্র-সেনাদের মদদে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে। আদিবাসী নেতা বিপুল চাকমাসহ অনেককে হত্যা করা হয়েছে। পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় মদদে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত চলছে।
পাহাড়ের মূল সমস্যা হচ্ছে সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর উপর জাতিগত নিপীড়ন। এরই অংশ হিসেবে পাহাড়ি জাতিসত্তার প্রথাগত ভূমি মালিকানা থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। তার অংশ হিসেবে নারী নির্যাতন চলছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার ও তাদের সাথে ক্ষমতার ভাগ-পাওয়া প্রতারকরা সংস্কারের যত বড় বড় বুলিই ছাতুক না কেন, পার্বত্য অঞ্চলে নিপীড়িত জাতিসত্তাগুলোর জন্য কোনো একটি হাতবাচক সংস্কারও তারা করেনি।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন মনে করে পাহাড়ের জনগণের সমস্যার সমাধান করতে হলে ভূমি সমস্যার সমাধান ও সেখানে জাতিগত নিপীড়নের সম্পূর্ণ অবসান ঘটাতে হবে। ভূমি সমস্যার সমাধানের সাথে পাহাড়ের লোভের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ও পৃথক জাতিসত্তার স্বীকৃতি, পাহাড়ে জোর পূর্বক গরিব বাঙালি জনগণের পুনর্বাসন বন্ধ করা, পাহাড়ে অঘোষিত সেনা-শাসনের অবসান ঘটানো এবং পার্বত্য অঞ্চলের পরিপূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা। পাহাড়িদের জন্য মায়াকান্না করলেও সাম্রাজ্যবাদীরা ও এনজিওরা এসব মৌলিক কর্মসূচিকে কার্যত তুলে ধরে না।
তাই পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে প্রয়োজন শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে বিপ্লবী কর্মসূচির ভিত্তিতে প্রকৃত শত্রুর বিরুদ্ধে আদিবাসী-বাঙালি জনগণের ঐক্যবদ্ধ লড়াই চালিয়ে যাওয়া।
কৃষি এবং কৃষক সমস্যা: বাংলাদেশ একটি কৃষ্টিপ্রধান দেশ। কিন্তু কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদী অনুপ্রবেশ প্রায় প্রতিবছরই হাওরের কৃষকদের বন্যার সম্মুখীন হতে হয়। প্রতিবছরই বাজেটে বাঁধের জন্য বরাদ্দ থাকলেও নির্মাণ হয় না টেকসই বাঁধ। যার ফলে বাঁধ ভেঙে লক্ষ লক্ষ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গিয়ে দিচ্ছে। দেশের স্বনির্ভর কৃষিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো থেকে সার বীজ, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষক। সার, বীজ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, তেলের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় কৃষকরা উৎপাদন খরচ মিটিয়ে লাভবান হতে পারছেন না। অন্তর্বর্তী সরকার বর্তমানে সার ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। কৃষিপণ্যের বাজার- সিন্ডিকেট নির্ভরতার দরুন কৃষকদের উদ্বৃত্ত মূল্য শোষণ করে নিচ্ছে আমলা-মুৎসুদ্দি শ্রেণি। অন্তর্বর্তী সরকারও পূর্বের সরকারগুলোর মতোই কৃষিতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ায়নি। চায়নি। হাওরের মানুষেরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। খরায় উত্তরাঞ্চলেও কৃষকদের দুর্বিষহ অবস্থা। সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনে ঘূর্ণিজড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা-খরায় লক্ষ লক্ষ কৃষক জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন।
গত ২৬ মার্চ থেকে ২৫ আগষ্ট পর্যন্ত ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে, ঋণের বোঝা পরিশোধ করতে না পেরে ৯ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন বলে সংবাদ মাধ্যম হতে জানা যায়। সাম্রাজ্যবাদ, আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ ও এনজিওদের শোষণ-নির্যাতনের কারণে কৃষক জনগণ সর্বশান্ত ও হতাশ হচ্ছেন। কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী কালো থাবার কারণেই কৃষকদের দূরবস্থা এবং এই কারণেই আত্মহত্যার প্রবণতা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর কৃষি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন। বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন মনে করে বিপ্লবী মতাদর্শে সজ্জিত কৃষকরাই কৃষি বিপ্লবের জন্য দিতে পারে।
শ্রমিক সমস্যা: নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য থেকে শুরু করে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য আকাশগুমী। কিন্তু বাড়েনি শ্রমিকের বেতন। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য ২০২৩ সালে শ্রমিকেরা জঙ্গি আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাদের ন্যায্য আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালিয়েও য়ের শ্রমিককে হত্যা করে। ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের পতন হলে তার সাথে পালিয়ে যায় তার দালাল গার্মেন্টস মালিকদের একাংশ। শ্রমিকেরা বকেয়া মজুরির দাবিতে আন্দোলন করলে সেখানেও ইউনুসের পুলিশ বাহিনী গুলি চালিয়ে ৪ জন শ্রমিককে হত্যা করে এবং আহত করে শতাধিককে। পরিবহন শ্রমিক, চা শ্রমিক, ধানকল শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিকসহ সকল সেক্টরের শ্রমিকদেরই মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন সরকারের এহেন গণবিরোধী চরিত্রের তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছে। এবং গার্মেন্টসসহ সকল সেক্টরের শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ২৫,০০০ টাকা করার জোর দাবি জানাচ্ছে।
* পোশাক কারখানায় দূর্গটনার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এবছরেই অক্টোবরে অগ্নিকান্ডে ঢাকার মিরপুরে পোশাক কারখানায় ১৬ জন নিহত এবং চট্টগ্রামের । সিইপিজেডে ৭ তলা একটি গার্মেন্টসে, কালশিতে একটি গার্মেন্টসে আগুন লেগে শত শত শ্রমিক কর্মহারা হন। বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন রাষ্ট্র এবং মালিক শ্রেণির দায়িত্বহীনতা এবং অব্যবস্থাপনায় তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।
ট্রাফিক পুলিশের সহায়তাকারী হিসেবে নিয়োগ নেয়া টালিকার্থীরা গণবিরোধী সিস্টেমের সাথে সোপ্রোতভাবে জড়িয়ে রিক্সা শ্রমিকদের উপর নিপীড়ন ভরে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভবঘুরে উচ্ছেদের বামে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
* প্যাডেল চালিত এবং ব্যাটারি চালিত শ্রমিকদের মধ্যে অবৈরী অন্দকে বৈরিতায় রূপ দিচ্ছে গণবিরোধী সরকার ও রাষ্ট্র। ব্যাটারিচালিত রিক্সা মালিক ও শ্রমিকদের বিকল্প ব্যবস্থা না করে রিক্সা উচ্ছেদ ও চালকদের হয়রানিকে বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন প্রতিবাদ করছে এবং রিক্সা শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে এর বিরুদ্ধে লড়াই করার আহ্বান জানাচ্ছে।
* সকল সেক্টরে নারী শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক ওভারটাইম, হোলনাইট বাতিল এবং সবেতনে ৬ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রদানের দাবি জানাচ্ছে। প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন-মানের উন্নয়ন, নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নারী শ্রমিকদের শারীরিক-মানসিক এবং যৌন নির্যাতন বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছে।
* বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নামে আদম পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে অসংখ্য যুবকের দুর্বিসহ ভোগান্তির অবসান, দায়ীদের উপযুক্ত শান্তি ও ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরতদানের ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক
চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন অর্থনীতি চাঙ্গা করতে অভ্যন্তরীণ বায় কমানো এবং বাণিজ্য যুদ্ধের মাধমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প বিশ্বের ৫৭টি দেশের পণ্য রপ্তানির উপর ৫০% শুদ্ধ আরোপ করে। চীনসহ দেশে দেশে দর কষাকষি করে নিজ স্বার্থ আদায় করে কিছু শুল্ক কমাচ্ছে। বাংলাদেশ তার মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে চীন-রাশিয়াকে কোণঠাসা করে বিশ্বব্যাপী মার্কিন কর্তৃত্ব বজায় রাখা বা মধ্যপ্রাচ্যে একক কর্তৃত্ব সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ চলছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে মার্কিন মদদে গণহত্যা চলছে। ইসরায়েল-ফিলিস্ক্রিন তথাকথিত যুদ্ধ বিরতির নি নামে চলছে মার্কিন-ইসরয়েলি দখলদারিত্ব। সিরিয়ায় রুশপন্থী ফ্যাসিস্ট সরকারকে উচ্ছেদ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মার্কিনের দালাল ফ্যাসিস্ট শক্তি। মার্কিন সহ বিশ্ব জনগণের উপর যুদ্ধসহ অর্থনৈতিক চাপ মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে নেমে আসছে। সাম্রাজাবাদী সংকট এখন ৩য় বিশ্বযুদ্ধের দিকে আগাচ্ছে। বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদী অন্যায় যুদ্ধ প্রতিহত করতে ছাত্র-যুব-তরুণদের সোচ্চার হতে আহ্বান জানাচ্ছে।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের অপারেশন কাগার: হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট মোদী সরকার “অপারেশন কাগার” নামের সামরিক অভিযান চালিয়ে ভারতের মাওবাদী ও সাধারণ আদিবাসী জনগণকে হত্যা-দমন-নির্যাতন করে মাওবাদীদের নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক-আদিবাসীদের বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে। বিশ্বের গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল পার্টি, সংগঠন, শক্তি ও নিপীড়িত জনগণ এর নিন্দা ও প্রতিবাদ করছে। কমরেড বাসবরাজসহ মাওবাদী নেতা-কর্মী ও আদিবাসী জনগণের গণহত্যার আমরা তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।
মাওবাদীদের আত্মসমর্পণ মঞ্চস্থ সম্পর্কে: তীব্র দমন-পীড়নের মধ্যে মোদি সরকার মাওবাদীদের আত্মসমর্পণ নাটক মঞ্চস্ত করছে। এর নায়ক হচ্ছে ভেনুগোপাল (সোনু) নামে এক বিশ্বাসঘাতক। ভারতের মাওবাদী পার্টির নেতৃত্বগণ এর বিরুদ্ধে দুই লাইনের সংগ্রাম চালিয়ে বিশ্বাসঘাতকদের মুখোশ উন্মোচন করছেন এবং বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামকে উর্ধ্বে তুলে ধরছেন এই লাইনে কর্মী-জনগণকে উজ্জীবিত করছেন। দুই লাইনের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি রক্ষা ও বিকশিত হবে।
ভারতসহ বিশ্বের দেশে দেশে বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক, প্রগাতিশীল পার্টি-সংগঠন এবং নিপীড়িত অনগণের সাথে বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন ভারতের মাওবাদীদের দ্বারা চালিত গণযুদ্ধকে উর্ধ্বে তুলে ধরছে এবং আত্মসমর্পণকারীদের বর্জন করছে।
দেশে দেশে জেন-জিদের আন্দোলন: বিশ্বের দেশে দেশে (বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলংকা, পেরু, মাদাগাস্কার) তরুণরা সাম্রাজ্যাবাদী বিশ্ব ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত বিদ্রোহ করছেন। এর আগে আরব বসন্ত মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী তরুণদের এই বিদ্রোহ-বিক্ষোভকে আমরা দৃঢ়ভাবে সমর্থন করছি। একই সাথে তরুণদের প্রতি আহ্বান সাম্রাজ্যবাদ, দালাল শাসকশ্রেণির ক্ষমতা-বহির্ভূতদের ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না হয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের আদর্শে সজ্জিত হয়ে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে কৃষি-বিপ্লবের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার-সংবিধান-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সামিল হোন!
মতাদর্শগত: চেয়ারম্যান মাও সে-তুঙ-এর মৃত্যুর পরপরই সংশোধনবাদীরা সমাজতান্ত্রিক চীনের ক্ষমতা দখল করে। সেই থেকে শুরু হওয়া অধঃপতনের এ পর্যায়ে ভুয়া কমিউনিস্ট পার্টির নেতা শি জিন পিং বিশ্বমোড়ল হওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে সে লক্ষ্যেই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মার্কিনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শি জিন পিং চিন্তাধারা নামে প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শ এক সময়ের নিপীড়িত জনগণের সমাজতান্ত্রিক চীনকে গণবিরোধী সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদী চীনে পরিণত করেছে। এই চীন দেশকে আবার সিপিবি সহ আরও কিছু বাম সংগঠন সমাজতান্ত্রিক চীন বলে গুণগান করছে। বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন ভুয়া সমাজতন্ত্রীদের মুখোশ উন্মোচন এবং একই সাথে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের দেশ চীনের জনগণকে চেয়ারম্যান মাও সে-তুঙের শিখিয়ে দেওয়া পথ অনুসরণ করে ভুয়া কমিউনিস্ট পার্টিকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহবান জানাচ্ছে।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র